বুধবার, ০১ Jul ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু

নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ এ রায় ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল।

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নাম্বার অভিযোগে তাকে খালাস দেন আদালত। এ সময় কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন হাসানুল হক ইনু। রায়ের আগে পুলিশদের হাত ধরতে নিষেধ করেন তিনি।

বহুল আলোচিত এ মামলার রায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করেছে। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।

ইনুর বিরুদ্ধে আনা আট অভিযোগ হলো :

প্রথম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক অ্যাখ্যা দেন ইনু। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা দেন এবং হত্যারও নির্দেশ দেন তিনি। দ্বিতীয় অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোটের সভা হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর সিদ্ধান্ত হয়। হাসানুল হক সেই সভায় উপস্থিত থেকে ‘শুট অ্যাট সাইটের’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেন।

তৃতীয় অভিযোগ, ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার তালিকা প্রণয়ন এবং তাঁদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ। চতুর্থ অভিযোগ, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্রের ব্যবহার করা এবং ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিংয়ের পরিকল্পনা করার অভিযোগ।
পঞ্চম অভিযোগ, গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। সরকারের গ্রহণ করা হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন–নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করা। ষষ্ঠ অভিযোগ, ১৪–দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সপ্তম অভিযোগ, শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকা। অষ্টম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যায় নির্দেশনা প্রদান। পাশাপাশি সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।

এর আগে গত ২২ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ৩০ জুন তারিখ নির্ধারণ করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১৪ মে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়।

শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং ফারুক আহাম্মদ। অন্যদিকে আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও সিফাত মাহমুদ।

অভিযোগ দাখিলের দিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এবং জাসদের সুপ্রিম নেতা হিসেবে নিয়মিত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তিনি ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে স্থানীয় এসপি এবং দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিতেন।

শেখ হাসিনাকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন সশস্ত্র ক্যাডারদের বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে নির্দেশনার বিষয়েও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও হাসানুল হক ইনুর ফোনালাপ বিশেষজ্ঞ মতামত এবং ট্রান্সক্রিপ্টসহ দাখিল করার কথা জানিয়ে কৌঁসুলি মিজানুল বলেছিলেন, কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ধরে মেরে ফেলার ইঙ্গিত দেওয়া হয় এবং প্রচারের কৌশল হিসেবে ‘জঙ্গি নাটকের কার্ড’ খেলার কথা বলা হয়।

ফোনালাপে ৫ অগাস্ট কারফিউ উঠিয়ে দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ২ হাজার লোক ঢাকায় জমায়েত করে শিবিরের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং বিএনপিকে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। এছাড়া জোনায়েদ সাকি ও সাইফুল হককে কীভাবে দলে টানা যায়, সে বিষয়েও দুজনের কথা হয়।

গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের শুনানির একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল ইনুর উদ্দেশে বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে; তিনি ‘গিল্টি প্লিড’ (দোষ স্বীকার) করলে কাজ শেষ হয়ে যাবে, নয়তো বিচার শুরু হবে।

জবাবে ইনু তার আবেদন আমলে না নেওয়ার অভিযোগ তুললে ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, তার আবেদনটি খারিজ করা হয়েছে। এরপর ইনু কথা বলার অনুমতি চাইলে প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীর মাধ্যমে কথা বলার নিয়ম মনে করিয়ে দেয়।

তার পরও ইনু নিজেকে ‘রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার’ দাবি করে বলেছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টা গায়েবি মামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তার বিরুদ্ধে সিএমএম কোর্টে ৬০টি মামলা চলমান এবং ট্রাইব্যুনালেও গায়েবি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি মনে করি আল্লাহর পর বিচার নিষ্পত্তির প্রতিনিধি আপনি। আপনি ন্যায়বিচার করবেন।’

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর কৌঁসুলি আব্দুস সোবহান তরফদারের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষী হিসেবে মেহেরপুরের বাসিন্দা রাইসুল হকের জবানবন্দির মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যপর্ব শুরু হয়। দীর্ঘ এই বিচারে প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।

এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৩ জন, বিশেষজ্ঞ ২ জন, ভুক্তভোগী পরিবারের ১ জন, জব্দ তালিকার ২ জন, জেলার ১ জন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষীও দেন। মামলায় ২০ সিরিজের ডকুমেন্ট এবং ৫টি বস্তু উপস্থাপন করা হয়।

বিচার চলাকালে গত ১১ মার্চ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য দেন ইনু। সেখানে তিনি সব অভিযোগকে কাল্পনিক, বিদ্বেষপ্রসূত ও বানোয়াট দাবি করেন। গত ২ এপ্রিল ইনুর পুনর্তদন্ত ও সাক্ষী তলবের আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন থেকেই আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে, যা চলে টানা নয় দিন। এরপর ৬ মে আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করে ইনুর খালাস দাবি করেন। এরপর ১৪ মে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে।

ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, আসামিপক্ষ এই আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের বদলে ‘সংঘাত’ ও ‘অস্থিরতা’ বলে আদালত অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছে। উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল-২ সেদিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে এবং সবশেষ ২২ জুন রায়ের জন্য মঙ্গলবার দিন ঠিক করে দেয়।

২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসা থেকে হাসানুল হক ইনুকে আটক করা হয়। শুরুতে নিউ মার্কেট থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্যে গত বছরের ২১ অগাস্ট কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, বর্তমানে তার মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার দেখানো মামলার সংখ্যা ৮৭টি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা হাসানুল হক ইনু ১৯৭০ সালে বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের সময় তিনি প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে দলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচনি রাজনীতিতে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে পরাজিত হলেও, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com